শনিবার, ২৮ মার্চ ২০২৬, ০২:৩০ পূর্বাহ্ন

দেশজুড়ে ৬৫১ শীর্ষ চাঁদাবাজের তালিকা: অর্ধেকই রাজনৈতিক কর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
ঢাকা: সারা দেশে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট নির্মূলে কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে সরকার। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত খসড়া তালিকায় উঠে এসেছে ৬৫১ জন শীর্ষ চাঁদাবাজের নাম। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকাতেই দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৩২৪ জন। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই তালিকার প্রায় অর্ধেকই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতা-কর্মী।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রমজান ও পরবর্তী ঈদকে সামনে রেখে জনমনে স্বস্তি ফেরাতে এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে দেশব্যাপী একযোগে বিশেষ অভিযান শুরু হবে। প্রভাবশালী ও ‘গডফাদার’দের গ্রেপ্তারে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

অভিযানে জিরো টলারেন্স
গত ৪ মার্চ ডিএমপি সদর দপ্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা হবে না। তিনি বলেন, “তালিকা তৈরিতে পুলিশকে সম্পূর্ণ নির্মোহ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আমাদের প্রধান লক্ষ্য আইনের শাসন ও জননিরাপত্তা।” যেসব চাঁদাবাজের নাম অন্তত দুটি সংস্থার তালিকায় রয়েছে, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হবে।

গোয়েন্দা তথ্যে চাঁদাবাজির মানচিত্র
র‌্যাব সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ব্যাটালিয়নভিত্তিক তালিকায় র‌্যাব-১১ এলাকায় (নারায়ণগঞ্জ ও সংলগ্ন) সর্বোচ্চ ১১০ জন চাঁদাবাজ শনাক্ত হয়েছে। এছাড়া র‌্যাব-১২-এ ৬৩ জন এবং র‌্যাব-১-এ ৬১ জনসহ অন্যান্য ইউনিটেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অপরাধীর নাম রয়েছে।

ডিএমপির ক্রাইম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৫০টি থানার মধ্যে তেজগাঁও বিভাগে সর্বোচ্চ ১২৭ জন চাঁদাবাজ সক্রিয়। এর মধ্যে কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট এলাকাতেই রয়েছে ৪০ জন। এছাড়া মোহাম্মদপুরে ৩১, শিল্পাঞ্চলে ৩০ এবং মিরপুরের দারুসসালামে ২৬ জন চাঁদাবাজির রাজত্ব কায়েম করেছে। এরা মূলত নির্মাণাধীন ভবন, বাসস্ট্যান্ড, মহাসড়ক ও লঞ্চঘাটকে আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করছে।

রাজনৈতিক প্রভাব ও জামিন আতঙ্ক
তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের বড় অংশই প্রভাবশালী রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় রয়েছে। এমনকি বিগত সরকারের আমলের চিহ্নিত চাঁদাবাজরা বর্তমানে নতুন প্রভাবশালীদের আশ্রয়ে সক্রিয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

১২ মার্চ ডিএমপির অপরাধ পর্যালোচনা সভায় পুলিশ কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, অনেক ক্ষেত্রে কঠোর পরিশ্রমে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হলেও তারা দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হচ্ছে। এটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাম্প্রতিক নৃশংসতা
সম্প্রতি পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ঘের দখল, রাজশাহীর পবায় ব্যবসায়ীর কর্মচারীকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো এবং সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে চাঁদা না পেয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধার ঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব ঘটনায় ছাত্রদল ও যুবদলের স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতার নাম আসায় সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট দলগুলো। এছাড়া রাজধানীর বসিলার ত্রাস ‘কালা ফারুক’ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার চাঁদাবাজির ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, “অপরাধীকে দলীয় বিবেচনায় আড়াল করলে পরিস্থিতি কখনোই স্বাভাবিক হবে না। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উচিত সরাসরি দলীয় প্রধানদের কাছে এসব অপরাধীর তালিকা পৌঁছে দেওয়া।”

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, “চাঁদাবাজিতে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের কোথাও কেউ ছাড় পাবে না।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

© All rights reserved © 2024  Ekusharkantho.com
Technical Helped by Curlhost.com